দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

বাবাকে কবর দেওয়ার জন্য জায়গা খুঁজছিলেন ২০ বছর বয়সী ওমর আল-সাওহি। কিন্তু গাজার গাজা সিটির জেইতুন কবরস্থানে গিয়ে তিনি দেখলেন, সারি সারি কবরের ভিড়ে নতুন করে কাউকে সমাহিত করার মতো জায়গাই নেই।
ওমরের বাবা ৪০ বছর বয়সী মোহাম্মদ আল-সাওহি গত ১০ জুন ইসরায়েল নির্ধারিত সামরিক এলাকা ‘ইয়েলো লাইন’-এর কাছে গুলিতে নিহত হন। গাজা সিটির জেইতুন এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ একটি সড়কের পাশে ছোট দোকানে চা-কফি বিক্রি করছিলেন। এ সময় তার গলায় গুলি লাগে এবং প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই তিনি মারা যান।
বাবাকে সমাহিত করতে জেইতুন কবরস্থানে গিয়ে ওমর দেখতে পান, কবরগুলো একটির সঙ্গে আরেকটি গা ঘেঁষে রয়েছে। ইসরায়েলের চলমান গাজা যুদ্ধে নিহত বহু মানুষের কবর সেখানে। জায়গার সংকট ও যুদ্ধের কঠিন পরিস্থিতির কারণে অনেক কবরের চিহ্ন বলতে শুধু একটি পাথর, আর তাতে মৃত ব্যক্তির নাম লেখা কাগজ।
ওমর বলেন, ‘আমি কবরস্থানের মাঝখানে দাঁড়িয়ে অসংখ্য কবর দেখেছি। সেখানে বালুর পাহাড়ের নিচে মানুষ শুয়ে আছে।’
তিনি বলেন, যুদ্ধের আগের মতো কবর তৈরি বা প্রস্তুত করার সুযোগ নেই। অনেক ক্ষেত্রে একটি পাথরের সঙ্গে নাম লেখা কাগজই এখন কবরের একমাত্র পরিচয়।
বর্তমানে সেখানে একটি কবরের জন্য প্রায় ৫০০ শেকেল, অর্থাৎ ১৬৭ মার্কিন ডলার খরচ হয়। ওমরের পরিবারের পক্ষে এই অর্থ জোগাড় করা সম্ভব ছিল না। তার ওপর নতুন কবর দেওয়ার মতো জায়গাও পাওয়া যায়নি। শেষ পর্যন্ত বাবাকে দাদার কবরেই সমাহিত করতে হয়।
ভেঙে পড়া ব্যবস্থার মধ্যে শেষ আশ্রয়ের সংকট
গাজায় সেবাব্যবস্থার ব্যাপক ভেঙে পড়া এবং ইসরায়েলি হামলার ঝুঁকির কারণে যুদ্ধ চলাকালে হাজার হাজার ফিলিস্তিনি নিহত হলেও তাদের ‘নিখোঁজ’ হিসেবে গণনা করা হয়েছে। অনেককে বাগানে, তাঁবুর পাশে, বাস্তুচ্যুতদের শিবিরে, স্কুলে কিংবা হাসপাতালের প্রাঙ্গণে সমাহিত করা হয়।
২০২৫ সালের অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতির পর ইসরায়েলি সহিংসতা তুলনামূলক কমে এলে বহু পরিবার ধ্বংসস্তূপ বা অস্থায়ী কবর থেকে স্বজনদের মরদেহ উদ্ধারের চেষ্টা শুরু করে।
যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পরও অন্তত ১ হাজার ২০০ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। গাজার কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, হাসপাতাল প্রাঙ্গণের সাতটি গণকবর থেকে ৫২৯ ফিলিস্তিনির দেহাবশেষ উদ্ধার করা হয়েছে।
সহিংসতা কিছুটা কমে আসার সুযোগে মোহাম্মদের পরিবারও তার দেহাবশেষ তুলে এনে কবরস্থানে স্থায়ীভাবে সমাহিত করে।
তবে গাজায় কবরের জায়গার সংকট শুধু ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে যুদ্ধে নিহত ৭৩ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনির কারণে নয়। ইসরায়েলি হামলায় বহু কবরস্থানও ধ্বংস হয়েছে।
গাজার ধর্মবিষয়ক ও দানবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর পর ৪০টির বেশি কবরস্থান ধ্বংস হয়েছে। ইসরায়েলি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকাগুলোতে কবরস্থানে প্রবেশেও কঠোর বিধিনিষেধ রয়েছে। ফলে সমাহিত করার জন্য পরিবারের হাতে থাকা জায়গা আরও কমে গেছে।
ইসরায়েলি বোমাবর্ষণ ও বাস্তুচ্যুতির নির্দেশে লাখো ফিলিস্তিনি ঘরছাড়া হয়েছেন। বাস্তুচ্যুতদের আশ্রয়ের জন্য আগে কবরস্থান হিসেবে নির্ধারিত কিছু এলাকাও ব্যবহার করা হচ্ছে।
কবর দেওয়ার খরচও বেড়েছে
কবরের ফলকসহ বিভিন্ন উপকরণের সংকটের কারণে গাজায় এখন একটি দাফনে ৭০০ থেকে ১ হাজার শেকেল, অর্থাৎ ২৩৫ থেকে ৩৩৫ মার্কিন ডলার পর্যন্ত খরচ হচ্ছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
অর্থের অভাবে অনেক কবরের চিহ্ন হিসেবে ধ্বংস হওয়া ভবনের ইট-পাথর, কাদা কিংবা ঢেউটিন ব্যবহার করা হচ্ছে। পরে অর্থের ব্যবস্থা হলে সেখানে স্থায়ী কবরফলক বসানোর চেষ্টা করেন স্বজনরা।
ধর্মবিষয়ক ও দানবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের গণমাধ্যম কর্মকর্তা ইকরামি আল-মাদাল্লাল বলেন, গাজার ৬০টি কবরস্থানের অনেকগুলোই যুদ্ধ শুরুর আগেই প্রায় পূর্ণ হয়ে গিয়েছিল।
তিনি বলেন, ‘সমাহিত করার জায়গার সংকটের কারণে আমাদের নতুন কবরস্থান স্থাপন করতে হবে।’
নতুন কবরস্থানের জন্য জায়গা খুঁজছে মন্ত্রণালয়। একই সঙ্গে অস্থায়ীভাবে সমাহিত মরদেহগুলো কবরস্থানে স্থানান্তর করাও কর্তৃপক্ষের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আল-মাদাল্লাল বলেন, মরদেহ স্থানান্তর ইচ্ছেমতো করা যায় না। এ জন্য ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষের মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন।
৬০ কবর থেকে ৬ হাজার
দীর্ঘ ১৯ বছরের বেশি সময় ধরে কবর খোঁড়ার কাজ করছেন ৫০ বছর বয়সী তাফেশ আবু হাতাব। তার কর্মস্থল খান ইউনিস কবরস্থানে যুদ্ধ শুরুর সময় কবর ছিল প্রায় ৬০টি। এখন সেখানে কবরের সংখ্যা প্রায় ৬ হাজার।
যুদ্ধের একপর্যায়ে তাকে প্রতিদিন প্রায় ৩৫টি কবর প্রস্তুত করতে হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘এত ভয়াবহ রক্তপাতের সময় আমরা আগে কখনো দেখিনি। এমন কোনো দিন যায় না, যেদিন কয়েক ডজন শহীদকে কবর দেওয়া হয় না।’
তার হাতে আসা মরদেহের মধ্যে নারী ও শিশু, এমনকি নবজাতকও রয়েছে। কখনো ইসরায়েলি বোমায় একটি ভবন, গাড়ি বা তাঁবু ধ্বংস হলে একই পরিবারের একাধিক সদস্যের মরদেহ একসঙ্গে কবরস্থানে আসে।
ধ্বংসস্তূপ আর কবরের মধ্যকার সেই নির্মম বাস্তবতার কথা তুলে ধরে তাফেশ আবু হাতাব বলেন, ‘তারা আমাদের মাথার ওপর আমাদের ঘরবাড়ি ধ্বংস করে। আর সেই ঘরগুলোর ধ্বংসস্তূপ দিয়েই আমরা আমাদের কবর তৈরি করি।’
/অ